Skip to content
ejobupdate

লাখপতি দিদি স্কিম : পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ নারী শক্তির অর্থনৈতিক জাগরণ ও সম্পূর্ণ গাইডলাইন

Advertisement

ভারতের গ্রামীণ অর্থব্যবস্থায় নারীরা বরাবরই মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের কাজ ‘অদৃশ্য’ রয়ে যেত অথবা উপার্জনের অঙ্কটি ছিল অত্যন্ত নগণ্য। এই ব্যবধান ঘোচাতে এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে শুরু হয়েছে লাখপতি দিদি যোজনা। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পটি ‘আনন্দধারা’ (West Bengal State Rural Livelihoods Mission) প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

১. লাখপতি দিদি আসলে কী? একটি স্বচ্ছ ধারণা

‘লখপতি দিদি’ কোনো মাসিক ভাতা বা নগদ টাকা সরাসরি দেওয়ার প্রকল্প নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন মডেল। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ভারতের প্রতিটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সদস্যকে এমনভাবে কারিগরি ও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ঋণের ব্যবস্থা করা, যাতে তাঁরা বছরে অন্তত ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেন। অর্থাৎ, খরচ বাদ দিয়ে দিদিদের পকেটে বছরে অন্তত এক লক্ষ টাকা থাকবে—এটাই মূল উদ্দেশ্য।

২. কেন এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি মাইলফলক?

পশ্চিমবঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী। গ্রাম বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে মহিলারা কোনো না কোনো উপসঙ্ঘ বা দলের সাথে যুক্ত। কিন্তু এতদিন তাঁরা মূলত ছোটখাটো সঞ্চয় এবং ঋণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। লাখপতি দিদি প্রকল্প তাঁদের এই ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে বের করে বড় ব্যবসার দুনিয়ায় নিয়ে আসছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের কয়েক লক্ষ নারী ড্রোন চালানো থেকে শুরু করে আধুনিক পশুপালনের মাধ্যমে নিজেদের আয় বহুগুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।

৩. লাখপতি দিদি প্রকল্পের প্রধান স্তম্ভসমূহ (Key Pillars)

এই কর্মসূচি মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

  • দক্ষতা উন্নয়ন (Skill Development): বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান।
  • আর্থিক সহায়তা (Financial Support): নামমাত্র সুদে বা বিনা সুদে পুঁজি বা লোনের ব্যবস্থা।
  • প্রযুক্তিগত সংযোগ (Technical Integration): ড্রোন, সোলার পাওয়ার বা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো প্রযুক্তি দিদিদের হাতে তুলে দেওয়া।
  • বাজার সংযোগ (Market Linkage): গ্রামীণ পণ্যকে শহরের সুপারমার্কেট বা অনলাইন ই-কমার্স (যেমন Amazon, Flipkart বা সরকারি ই-মার্কেটপ্লেস) প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেওয়া।

৪. প্রশিক্ষণের বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং উপার্জনের পথ

লখপতি দিদি হওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কেন্দ্রীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশন নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে:

ক) নমো ড্রোন দিদি (Namo Drone Didi)

এটি বর্তমানে এই প্রকল্পের সবথেকে আলোচিত এবং লাভজনক অংশ। কৃষিকাজে সার ও কীটনাশক ছিটানোর জন্য মহিলাদের ড্রোন চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

  • সুবিধা: একটি ড্রোন কিনতে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা খরচ হয়, যার ৮০ শতাংশ (প্রায় ৮ লক্ষ টাকা) সরকার ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে।
  • আয়: একজন ড্রোন দিদি নিজের এবং অন্যের জমিতে সার্ভিস দিয়ে মাসে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা অনায়াসেই আয় করতে পারেন।

খ) উন্নত প্রাণীপালন ও মৎস্যচাষ

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীন সংস্কৃতিতে হাঁস-মুরগি বা গরু পালন স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু লখপতি দিদি প্রকল্পে এটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শেখানো হয়।

  • ডেইরি ফার্মিং: উন্নত জাতের গাভী পালন এবং দুধ সংগ্রহের কেন্দ্র তৈরি।
  • মৎস্যচাষ: বায়োফ্লক (Biofloc) পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় বেশি মাছ চাষ।
  • ছাগল ও শুকর পালন: উন্নত ব্রিডিং এবং রোগ প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ।

গ) টেকনিক্যাল স্কিল ও ক্ষুদ্র শিল্প

  • এলইডি বাল্ব তৈরি: গ্রামের ক্লাবে বা সংঘে ছোট কারখানা তৈরি করে এলইডি বাল্ব ও টিউবলাইট তৈরি।
  • সোলার প্যানেল মেরামত: গ্রামীণ এলাকায় সৌর শক্তির ব্যবহার বাড়াতে সোলার টেকনিশিয়ান হিসেবে প্রশিক্ষণ।
  • খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ (Food Processing): আচার, পাঁপড় বা মশলার বদলে এখন রেডি-টু-ইট (Ready-to-eat) প্যাকেটজাত খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

৫. লাখপতি দিদি প্রকল্পের ডেটা ও পরিসংখ্যান (Table)

বিষয়বিবরণ ও আপডেট (২০২৬)
প্রকল্পের নামলাখপতি দিদি (Lakhpati Didi)
মূল লক্ষ্য৩ কোটি মহিলাকে লখপতি করা (সারা ভারতে)
আয়ের লক্ষ্যমাত্রাবার্ষিক নূন্যতম ১ লক্ষ টাকা (খরচ বাদে)
বাস্তবায়ন সংস্থাকেন্দ্রীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশন (NRLM) ও আনন্দধারা (WB)
আবেদনের মাধ্যমশুধুমাত্র স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সদস্যপদ
প্রশিক্ষণ খরচসম্পূর্ণ বিনামূল্যে (সরকারি খরচ)
লোন সুবিধা৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহজ কিস্তিতে ঋণ সুবিধা

৬. আবেদনের পদ্ধতি: ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গের একজন বাসিন্দা হন এবং লখপতি দিদি হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চান, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  1. স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নিবন্ধন: প্রথমে আপনার পাড়ার বা গ্রামের একটি স্বীকৃত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হতে হবে। দলটি যেন ব্লক অফিসে নিবন্ধিত থাকে।
  2. কমিউনিটি রিসোর্স পারসন (CRP) এর সাথে যোগাযোগ: প্রতিটি গ্রামে একজন সরকারি মনোনীত দিদিমণি বা CRP থাকেন। তাঁর কাছে আপনার আগ্রহের কথা জানান।
  3. আবেদনপত্র পূরণ: বিডিও অফিসে (NRLM বা আনন্দধারা বিভাগ) লখপতি দিদি হওয়ার একটি সার্ভে ফরম পূরণ করতে হয়। সেখানে আপনার বর্তমান আয় এবং আপনি কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে চান তা উল্লেখ করতে হবে।
  4. স্ক্রিনিং ও নির্বাচন: ব্লক লেভেল ফেডারেশন আবেদনগুলো যাচাই করবে। যাদের উন্নতির সম্ভাবনা বেশি এবং যারা নিয়মিত দলের মিটিংয়ে আসেন, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
  5. প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গমন: নির্বাচিত হওয়ার পর আপনাকে জেলার কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট দিনের জন্য (যেমন ড্রোনের জন্য ১৫ দিন) থাকতে হতে পারে।

৭. লাখপতি দিদি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র

আবেদন করার সময় নিচের কাগজগুলো হাতের কাছে রাখা জরুরি:

  • আধার কার্ড: আধার কার্ডের সাথে মোবাইল নম্বর লিঙ্ক থাকা বাধ্যতামূলক।
  • রেশন কার্ড: পরিবারের সদস্য সংখ্যার প্রমাণের জন্য।
  • ব্যাঙ্ক পাসবই: আপনার নিজের এবং আপনার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ব্যাঙ্কের খাতা।
  • স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য আইডি: আনন্দধারা পোর্টালে আপনার নাম থাকার প্রমাণ।
  • ইনকাম সার্টিফিকেট: বর্তমান বাৎসরিক আয়ের একটি স্ব-ঘোষণা পত্র।

৮. কেন এটি কেবল লোন নেওয়ার প্রকল্প নয়?

অনেকেই মনে করেন এটি হয়তো ব্যাংক থেকে লোন পাওয়ার একটি নতুন নাম। আসলে তা নয়। লখপতি দিদি মডেলটি শেখায় কীভাবে ‘উদ্যোক্তা’ হতে হয়। এখানে একজন মহিলাকে শেখানো হয়:

  • কিভাবে ব্যবসার হিসাব রাখতে হয় (Financial Literacy)।
  • কিভাবে নিজের পণ্যের ব্র্যান্ডিং করতে হয়।
  • কিভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট (UPI) ব্যবহার করে লেনদেন করতে হয়।
  • কিভাবে সরকারি ই-মার্কেটপ্লেস (GeM) পোর্টালে নিজের নাম রেজিস্টার করতে হয়।

৯. FAQ: সাধারণ কিছু জিজ্ঞাস্য

প্রশ্ন ১: আমি যদি বর্তমানে মাসে ২,০০০ টাকা আয় করি, আমি কি লাখপতি দিদি হতে পারব?

উত্তর: অবশ্যই। এই প্রকল্পের মূল কাজই হলো আপনার আয়কে মাসে অন্তত ৮,৫০০-১০,০০০ টাকায় (অর্থাৎ বছরে ১ লক্ষ টাকা) নিয়ে যাওয়া। প্রশিক্ষণ ও ঋণ আপনাকে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।

প্রশ্ন ২: স্বনির্ভর গোষ্ঠীর পুরোনো ঋণ থাকলে কি এই সুবিধা পাওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, যদি আপনার লোন রিপেমেন্ট বা টাকা ফেরত দেওয়ার রেকর্ড ভালো থাকে, তবে আপনি নতুন করে ব্যবসার জন্য ঋণ ও প্রশিক্ষণ পেতে পারেন।

প্রশ্ন ৩: ড্রোন দিদি হওয়ার জন্য কি কম্পিউটার জানা জরুরি?

উত্তর: খুব গভীর কম্পিউটার জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, তবে একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করতে জানা এবং ড্রোনের মৌলিক টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বোঝার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। সরকার ১৫ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়ে এটি শিখিয়ে দেবে।

প্রশ্ন ৪: পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কি এই সুবিধা পাওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, এটি একটি কেন্দ্রীয় প্রকল্প। ভারতের ২৮টি রাজ্য এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেই এই প্রকল্প চলছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এটি ‘নমো ড্রোন দিদি’ এবং ‘আনন্দধারা’র সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করছে।


১০. উপসংহার: আগামীর লক্ষ্য

২০২৬ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ব্লকে লাখপতি দিদিদের একটি বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে এবং তাঁরা পরিবারের বোঝা না হয়ে বরং পরিবারের মূল স্তম্ভে পরিণত হবেন।

আপনি যদি একজন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হন, তবে আজই আপনার দলের সদস্যদের সাথে কথা বলুন। মনে রাখবেন, সরকারি সুবিধা আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে, আপনাকে শুধু সঠিক পথে আবেদনটি করতে হবে। আপনার ব্লকের বিডিও অফিস অথবা গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসই হলো আপনার প্রথম গন্তব্য।

সতর্কতা: এই প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ার জন্য কাউকে আলাদা করে টাকা দেবেন না। এটি সম্পূর্ণ সরকারি পদ্ধতি এবং লোন বা প্রশিক্ষণের যাবতীয় বিষয় সরাসরি সরকারি আধিকারিক বা আপনার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ফেডারেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।